ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন

বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যাশার তুলনায় বেড়েছে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য

গোটা বিশ্বেই বাণিজ্য খাতকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। এর মধ্যেও বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি হয়েছে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

গোটা বিশ্বেই বাণিজ্য খাতকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। এর মধ্যেও বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি হয়েছে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বব্যাপী পণ্য বাণিজ্য বেড়েছে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর আগের প্রান্তিকের (২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় এ বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে বছরের বাকি সময়ে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য সম্প্রসারণের এ গতি অব্যাহত নাও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ডব্লিউটিও।

গত মঙ্গলবার বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ডব্লিউটিও। এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য আগের প্রান্তিকের তুলনায় অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে বছর শেষে বাণিজ্যের গতি কমে আসবে। কারণ অগ্রিম আমদানির ফলে এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুদ পূর্ণ রয়েছে এবং সামনে শুল্ক বেড়ে গেলে আমদানি চাহিদা কমতে পারে।

এর আগে এপ্রিলে প্রকাশিত এক পূর্বাভাসে চলতি বছর বিশ্বব্যাপী পণ্য বাণিজ্য সংকোচনের ধারায় থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল ডব্লিউটিও। তবে মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা সংশোধন করে বলা হয়েছে, সার্বিকভাবে ২০২৫ সালে কিছুটা প্রবৃদ্ধির দেখা পেতে পারে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য। বছরের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়ার কারণ সম্পর্কে ডব্লিউটিও বলছে, আমদানির ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের আগেই উত্তর আমেরিকা থেকে ব্যাপক হারে ক্রয়াদেশ বেড়েছিল। এ অগ্রিম আমদানি প্রবণতাই প্রথম প্রান্তিকে বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করেছে।

নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই শুল্কনীতিকে নিজের মূল বাণিজ্যনীতি হিসেবে তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর অক্টোবরে নির্বাচনের পর অগ্রিম আমদানির ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে, যার প্রভাব পড়ে ওই প্রান্তিকের বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর বড় বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দফায় দফায় প্রস্তাবিত এসব শুল্ক কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ ছাড়িয়ে গেছে। তবে বর্তমানে বেশির ভাগ শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে, যা আগামী মাস থেকে প্রযোজ্য হতে পারে।

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কার্যকরের আশঙ্কায় অনেক আমদানিকারক দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) আগেই ক্রয়াদেশ দিয়ে ফেলেন। ফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে উচ্চশুল্ক গুনতে না হলেও প্রথম প্রান্তিকে আমদানির পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। এ প্রবণতা বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করে।

এপ্রিলে ডব্লিউটিওর পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, চলতি বছর বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কমতে পারে, যা হতে পারে কভিড মহামারী-পরবর্তী সবচেয়ে বড় ধস। ওই সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংস্থার মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জিডিপি প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রবৃদ্ধি দেখবে বলেও সে সময় আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক বলেন, ‘যদি বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য সংকুচিত হয়, তবে এর প্রভাব সমগ্র জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা দেখেছি যে বাণিজ্য সম্পর্কিত উদ্বেগ আর্থিক বাজার ও অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

তবে মঙ্গলবার সংস্থাটি পূর্বাভাস সংশোধন করে জানিয়েছে, এবার বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি খুব সামান্য হলেও ইতিবাচক থাকবে—প্রায় দশমিক ১ শতাংশ।

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে প্রথম প্রান্তিকে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে আমদানি-রফতানির পার্থক্য স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। মার্কিন আমদানিকারকদের আগাম ক্রয়াদেশের পাশাপাশি কিছু বাণিজ্য চুক্তি ও নীতিগত পদক্ষেপও পণ্য বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি আমদানি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে উত্তর আমেরিকায়। অঞ্চলটিতে আমদানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর আফ্রিকায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে ৩ দশমিক ৬, মধ্যপ্রাচ্যে ৩, ইউরোপে ১ দশমিক ৩ ও এশিয়ায় ১ দশমিক ১ শতাংশ।

রফতানির দিক থেকে প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে মধ্যপ্রাচ্য ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর এশিয়া থেকে রফতানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, দক্ষিণ আমেরিকায় ৩ দশমিক ২, আফ্রিকায় ২ দশমিক ৫ ও উত্তর আমেরিকায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাণিজ্যের হিসাবে মৌসুমভিত্তিক ওঠানামা সমন্বয় করা হয়নি। মার্কিন ডলারে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের মূল্য আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেড়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও হ্রাসের তথ্যও তুলে ধরেছে ডব্লিউটিও। অফিস ও টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির রফতানি ১৬ শতাংশ বেড়েছে। রসায়নজাত পণ্য ১২ ও পোশাক রফতানি ৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে গাড়ি শিল্পসংক্রান্ত পণ্যের রফতানি ৪ শতাংশ, জ্বালানি ও খনিজ পণ্য ৪ এবং লোহা ও ইস্পাত ৩ শতাংশ হারে কমেছে। জ্বালানির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীলতা থাকলেও স্বর্ণ-রুপা বাদে ধাতু ও খনিজ পণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি ছিল।

এদিকে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আমদানি কার্যক্রমে ধীরগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে ডব্লিউটিও। সংস্থাটি বলছে, প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রথম দুই মাসে (এপ্রিল-মে) সে প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ১ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বাণিজ্য অংশীদার ও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।

আরও